আলুর বাজারদরে ধস নামায় চাঁদপুরের আলুচাষিরা চরম বেকায়দায় পড়েছেন। হিমাগারে রাখা আলু তারা যেমন তুলতে পারছেন না, তেমনি গত মৌসুমে বাকিতে কেনা আলুবীজের ধারদেনাও মেটাতে পারছেন না। এতে বিপাকে পড়েছে হিমাগার কর্তৃপক্ষও।
জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় আলুচাষির সংখ্যা ৫৬ হাজার ৮৬০ জন। সবচেয়ে বেশি আলু চাষ হয় চাঁদপুর সদর, মতলব দক্ষিণ ও কচুয়া উপজেলায়। এসব উপজেলার প্রত্যেকটিতে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়।
সরেজমিনে বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, সাপ্তাহিক হাটবাজারে এখনো পুরোনো আলু মাত্র ৭–৮ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে শহর ও গ্রামীণ হাটবাজারে আমদানি বেড়ে যাওয়ায় প্রায় সব ধরনের সবুজ শাকসবজির দাম কমেছে। শিম, বরবটি, করলা ও গাজর বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজিতে, টমেটো ৪০ টাকা কেজিতে। মাত্র ১৫–২০ দিন আগেও এসব সবজির দাম ছিল ৯০ থেকে ১২০ টাকা কেজি।
আলুর দাম কমে যাওয়ায় বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়ে এবার জেলায় অনেক চাষি আলু চাষে বিমুখ হয়েছেন। তারপরও জেলার বিভিন্ন স্থানে নতুন মৌসুমে অনেক চাষিকে আবার আলু বপনে ব্যস্ত দেখা যাচ্ছে। সদর, কচুয়া ও মতলব দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষিবিদ মোবারক হোসেন ইউএনবিকে বলেন, এবার আলুর বাজারে কোনো সিন্ডিকেট না থাকায় দাম কমই থাকবে। তিনি বলেন, ‘গত মৌসুমে সিন্ডিকেটের কারণে ক্রেতাদের ৮০ টাকা কেজিতে আলু কিনতে হয়েছে। এবার সে পরিস্থিতি নেই।’
কচুয়া উপজেলায় হিমাগারে আলু রাখা চাষিরা মারাত্মক সংকটে আছেন। একইভাবে বিপাকে পড়েছে হিমাগার কর্তৃপক্ষও। উপজেলার তিনটি হিমাগারে বিপুল পরিমাণ আলু মজুত আছে। বাজারদর পানির দরে নেমে আসায় প্রকৃত চাষিরা আলু বের করছেন না। ফলে হিমাগারের ভাড়া আদায় করতে পারছেন না কর্মচারীরা।
দুই হিমাগার ব্যবস্থাপক মঙ্গল খান ও ইয়াছিন মিয়া জানান, চাষিরা আলু না তুললে বা ফেরত না নিলে সেগুলো বিক্রি করেও ভাড়ার টাকা আদায় সম্ভব হচ্ছে না। কারণ হাটবাজারে আলুর দাম অত্যন্ত কম।
গত মৌসুমে জেলায় আলুর বাম্পার ফলন হয়েছিল। বর্তমানে বাজারে ভালো মানের পুরোনো আলু ৮–১০ টাকা কেজিতে এবং নতুন আলু ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
হাজীগঞ্জ উপজেলার বাণিজ্যিক কেন্দ্র বাকিলা বাজারে প্রবীণ আলুচাষি ও বিক্রেতা বাচ্চু মিজি বলেন, ‘আমার জমিতে ১০০ মণ আলু হয়েছে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি, পুরোটাই লস।’
তিনি ও অন্য চাষিরা জানান, সামনে তারা আর আলু চাষ করতে চান না।
সদরের শাহ মাহমুদপুর এলাকার চাষি বাবুল, মকবুল, জহুরুল হক, হানিফ পাটোয়ারি ও তার ছেলেরাও একই হতাশার কথা জানান।
হানিফ পাটোয়ারি বলেন, ‘গত মৌসুমের আলুবীজের টাকাই এখনো দিতে পারিনি। যে লস খেয়েছি, সামনে আর আলু চাষ করব না।’ তিনি আরও জানান, বাবুরহাট বিসিক শিল্পনগরীর হিমাগারে রাখা তার ৩৩ বস্তা (প্রতি বস্তা ৫০ কেজি) আলু বস্তাপ্রতি মাত্র ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।
কচুয়া উপজেলাতেও আলুচাষিদের অবস্থা ভালো নয়। লাভের আশায় তারা আলু হিমাগারে রেখেছিলেন। কিন্তু বাজারদর কম থাকায় সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। নভেম্বর ও ডিসেম্বরের শুরুতে আলু ফেরত নেওয়ার কথা থাকলেও এখনো অর্ধেকের বেশি আলু হিমাগারে পড়ে আছে। এতে কচুয়ার হিমাগার কর্তৃপক্ষের হতাশাও বাড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে জেলা সদর, হাইমচর, কচুয়া, মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণ উপজেলায় অধিকাংশ মাঠে আলু রোপণ ও বপনের কাজ চলছে। কোথাও জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে, আবার কোথাও শ্রমিক নিয়ে আলু রোপণ ও বপনে ব্যস্ত চাষিরা।
সদরের বাগাদীর শামসুল ইসলাম ও ধনপর্দির ইসমাইল হোসেন ও সুরুজ মিয়া জানান, গত বছর তারা আলুর ন্যায্য দাম পাননি। তাই এবার কম বা অর্ধেক জমিতে আলু চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবারও বাম্পার ফলনের আশা করছেন, তবে ভালো দাম পাওয়া যাবে কি না—তা নিয়ে তারা সন্দিহান।
অতি সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জ থেকে নৌপথে চাঁদপুরের বাজারে নতুন আলু আসতে শুরু করেছে। তবে নতুন আলুর দাম ৭০ টাকা কেজি থেকে নেমে ২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এতে ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে। বর্তমানে ৫ কেজি নতুন আলু ১০০ টাকা, আর ১০ কেজি পুরোনো আলু ৫০–৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কৃষিবিদ মোবারক হোসেন আরও জানান, জেলায় বর্তমানে ১০টি হিমাগার চালু রয়েছে। এতে মোট ৮০ হাজার ১৬৯ টন আলু সংরক্ষিত আছে। এসব হিমাগারের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ৮০ হাজার ২৫০ টন। তার মতে, যদি সিন্ডিকেট থাকত, তাহলে বাজারে আলুর দাম ৭০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে উঠত।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক কৃষিবিদ আবু তাহের ইউএনবিকে বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ হাজার ২০০ হেক্টর, যা গতবারের তুলনায় ১ হাজার হেক্টর কম। এর প্রধান কারণ হলো, চাষিরা আলুর প্রকৃত দাম না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন এবং আগের দেনা পরিশোধ করতে পারছেন না।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় চাষিদের সঙ্গে কথা বলে তিনি দেখেছেন, দাম ভালো পেলে চাষিরা স্বাভাবিকভাবেই সেই ফসল চাষে আগ্রহী হন।